প্রকাশিত: ০৫/০২/২০২২ ৯:৪২ এএম

রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহর জীবন হুমকিতে বা তাঁকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হত্যার হুমকি দিয়েছে—এমন কোনো তথ্য বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে ছিল না। রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের জিজ্ঞাসার জবাবে বাংলাদেশ লিখিতভাবে এ তথ্য জানিয়েছে।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ঘাতকদের হামলায় নিহত হন মহিব উল্লাহ। এরপর আরো অন্তত ছয়জন রোহিঙ্গা ঘাতকদের হামলায় নিহত হন।
ওই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিষয়ে জানতে চেয়ে জাতিসংঘের পাঁচজন বিশেষজ্ঞ গত ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশকে চিঠি পাঠান।
বাংলাদেশ তার চিঠিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানোর ওপর জোর দেয়। চিঠিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ফেরার অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সব কিছু করছে। কিন্তু মিয়ানমারের অঙ্গীকারের অভাবে প্রত্যাবাসনে দেরি হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ফেরা আরো দেরি হলে রোহিঙ্গা শিবির ও ওই অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা-উদ্বেগ বাড়বে।

জাতিসংঘের ওই বিশেষজ্ঞরা হলেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার মরিস টিডবল-বিঞ্জ, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা ও উৎসাহিতকরণ বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান, মানবাধিকার কর্মীদের পরিস্থিতি বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ম্যারি লেলর, অভিবাসীদের মানবাধিকার বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ফেলিপ গনজালেস মোরালেস ও সংখ্যালঘু বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ফার্নান্দ দে ভ্যারেনেস।

চিঠিতে জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞরা মহিব উল্লাহ ও অন্য রোহিঙ্গাদের নিহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরে সেগুলোর তদন্ত, রোহিঙ্গা শিবির পরিস্থিতি, সুরক্ষার উদ্যোগ, রোহিঙ্গাদের মত প্রকাশ ও চলাফেরার অধিকার বিষয়ে জানতে চান। মহিব উল্লাহর ওপর কোনো হুমকি ছিল কি না তা-ও জানতে চান তাঁরা। বাংলাদেশ গত ৩ জানুয়ারি জবাব দিয়ে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশ বলেছে, মহিব উল্লাহর ওপর কোনো ধরনের হুমকি থাকার তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে ছিল না। হত্যাকাণ্ডের পরপরই একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ওই ঘটনা তদন্ত করছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সন্দেহভাজন ১২ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে চারজন ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী স্বীকারোক্তি দিয়েছে। মহিব উল্লাহর পরিবারের সব সদস্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

মহিব উল্লাহ দেশে-বিদেশে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ওই বছর তিনি জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদেও রোহিঙ্গাদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু পশ্চিমা দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওই হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানায়।

মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁর পরিবার আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে দায়ী করে। গত ৮ ডিসেম্বর বিভিন্ন দেশের ২১টি রোহিঙ্গা সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা শিবিরে মহিব উল্লাহসহ অন্যান্য হত্যার জন্য আরসাকে দায়ী করে। আরসাকে কঠোরভাবে দমন করতে সংগঠনগুলো বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানায়। তবে বাংলাদেশ সরকার বরাবরই বলে আসছে, এখানে আরসার অস্তিত্ব নেই। আরসাও এক বিবৃতিতে মহিব উল্লাহ হত্যায় তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করেছে।

আরসাকে দায়ী করে বিবৃতি দেওয়া সংগঠনগুলোর অন্যতম বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের (ব্রুক) সভাপতি তুন খিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহিব উল্লাহ হত্যার আগে কেউ হুমকি দিয়েছিল কি না তা তাঁর পরিবারের সদস্যরা বলতে পারবেন। কিন্তু আমাদের কাছে এ বিষয়ে প্রমাণ নেই। ’

মহিব উল্লাহ হত্যার পর অভিযোগ উঠেছিল, মহিব উল্লাহ প্রত্যাবাসের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। এ কারণে প্রত্যাবাসনবিরোধীরা তাঁকে হত্যা করে থাকতে পারে।

আরো ছয় রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের পর নেওয়া উদ্যোগ :

গত ২২ অক্টোবর ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে ছয় রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। এ সম্পর্কে চিঠিতে বাংলাদেশ জানিয়েছে, ওই হত্যাগুলোর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হত্যায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ জানিয়েছে, রোহিঙ্গা শিবিরে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। শিবিরের ভেতরে এপিবিএন জনবল বাড়িয়েছে। রাতে রোহিঙ্গাদের চলাচলের সুবিধা এবং আইন প্রয়োগকারী বাহিনীগুলোর নজরদারি সহজ করতে শিবিরের পথগুলোতে আলো নিশ্চিতের জন্য অতিরিক্ত সৌর বিদ্যুতের বাতি ও ন্যানো গ্রিড সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সচেতনতা জোরদার করতে নিয়মিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি) সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ : চিঠিতে বাংলাদেশ বলেছে, মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে কক্সবাজার ক্রমেই রোহিঙ্গাদের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। কয়েকটি অপরাধী গোষ্ঠী ও স্বার্থান্বেষী মহল রোহিঙ্গা শিবির পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। জমি ও জীবিকার সংকটের কারণে এই অঞ্চলে গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে।

পাঠকের মতামত

 

দুর্গম পাহাড়ি পথে বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গারা

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি ...

ইষ্ট বেকারের জ্যাম-ফিল্ড ব্রেডে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিক্রি বন্ধের নির্দেশ

মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের অভিযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিন ধরনের খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের ...

আর্জেন্টিনার জয়োল্লাসের ভিডিও করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের জয়ে আনন্দ মিছিলের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে নেত্রকোনায় একটি ভবনের ছাদে ...